ময়মনসিংহ রেঞ্জ ডিআইজির সঙ্গে মতবিনিময় সভার উদ্যোগ, শতাধিক সাংবাদিকের অংশগ্রহণের আগ্রহ
নিজস্ব প্রতিনিধি:
গত তিন বছরে পাঁচ সাংবাদিক হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু তদন্ত, জড়িতদের গ্রেপ্তার এবং নিহতদের পরিবারের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার দাবিতে ময়মনসিংহ রেঞ্জের উপমহাপুলিশ পরিদর্শকের (ডিআইজি) সঙ্গে মতবিনিময় সভার উদ্যোগ নিয়েছে সাংবাদিক নির্যাতন প্রতিরোধ সেল বাংলাদেশ, ময়মনসিংহ জেলা শাখা। এ লক্ষ্যে সংগঠনটির কেন্দ্রীয় ও জেলা পর্যায়ের নেতৃবৃন্দের পক্ষ থেকে ২৪ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে একটি লিখিত আবেদন প্রস্তুত করা হয়েছে। ডিআইজির সুবিধাজনক তারিখ ও সময়ে সভা আয়োজনের অনুমতি চাওয়া হয়েছে ওই আবেদনে।
সংগঠনটির দাবি, ধারাবাহিক সাংবাদিক হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় গণমাধ্যমকর্মীদের মধ্যে উদ্বেগ ও নিরাপত্তাহীনতা বাড়ছে। এসব হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটন, প্রত্যক্ষভাবে জড়িত অপরাধীদের পাশাপাশি সম্ভাব্য পরিকল্পনাকারীদের শনাক্ত এবং পলাতক আসামিদের দ্রুত গ্রেপ্তারে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।
আলোচনায় থাকবে পাঁচ সাংবাদিক হত্যাকাণ্ড
আবেদনে উল্লেখ করা পাঁচ সাংবাদিক হলেন—জামালপুরের সাংবাদিক গোলাম রাব্বানী নাদিম ও শেলু আকন্দ, ময়মনসিংহের শম্ভুগঞ্জে নিহত সাংবাদিক স্বপন ভদ্র, ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়ার সন্তান ও গাজীপুরে নিহত সাংবাদিক আসাদুজ্জামান তুহিন এবং নেত্রকোনার দুর্গাপুরে গুলিতে নিহত সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান আলিফ ফকির।
বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে আলিফ ফকির হত্যাকাণ্ডের তদন্ত ও আসামিদের গ্রেপ্তারের অগ্রগতির বিষয়টিকে। আবেদনে প্রকাশিত সংবাদ ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, গত ১৫ অক্টোবর রাতে নেত্রকোনার দুর্গাপুর উপজেলার বিরিশিরি ইউনিয়নের উৎরাইল এলাকার তেলুনজিয়া গ্রামে দুর্বৃত্তদের গুলিতে তিনি নিহত হন। এ ঘটনায় তাঁর স্ত্রী আনন্দিতা সাংমা বাদী হয়ে দুর্গাপুর থানায় অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের আসামি করে হত্যা মামলা করেন।
আবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ১৭ অক্টোবর দিবাগত রাতে এ ঘটনায় সাজিবুল ইসলাম ওরফে অপূর্ব এবং প্রাঙ্গণ নামের দুজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পরে তাঁদের একজনকে আদালতে হাজির করে পুনরায় রিমান্ডের আবেদন করা হলে ২০ অক্টোবর আদালত তাঁর চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
সাত দফা বিষয়ে আলোচনার প্রস্তাব
প্রস্তাবিত মতবিনিময় সভায় সাতটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোচনা করতে চায় সংগঠনটি। এগুলোর মধ্যে রয়েছে—
১. পাঁচ সাংবাদিক হত্যাকাণ্ডের মামলাগুলোর তদন্ত ও বিচারিক অগ্রগতি পর্যালোচনা।
২. আলিফ ফকির হত্যাকাণ্ডে জড়িত সব অপরাধী ও সম্ভাব্য পরিকল্পনাকারীকে শনাক্ত এবং পলাতক আসামিদের গ্রেপ্তারে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ।
৩. প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও প্রভাবমুক্ত তদন্ত নিশ্চিত করা।
৪. তদন্তাধীন মামলাগুলোর যথাসময়ে প্রতিবেদন দাখিল এবং বিচারাধীন মামলাগুলোর দ্রুত নিষ্পত্তিতে আইনানুগ সমন্বয়।
৫. নিহত সাংবাদিকদের পরিবার ও গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
৬. কর্মরত সাংবাদিকদের পেশাগত নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যতে হত্যা, হামলা ও নির্যাতন প্রতিরোধে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ।
৭. পুলিশ প্রশাসন ও সাংবাদিক সংগঠনগুলোর মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ, পারস্পরিক সহযোগিতা ও সমন্বয় জোরদার করা।
সংগঠনটির নেতৃবৃন্দ মনে করেন, কোনো মামলার তদন্তে প্রতিবন্ধকতা থাকলে তা চিহ্নিত করে দূর করা জরুরি। একই সঙ্গে তদন্তের অগ্রগতি নিয়মিত পর্যালোচনা, আসামিদের গ্রেপ্তার এবং ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর ভূমিকা প্রয়োজন।
শতাধিক সাংবাদিকের অংশগ্রহণের আগ্রহ
আবেদনে বলা হয়েছে, প্রস্তাবিত সভায় সাংবাদিক নির্যাতন প্রতিরোধ সেল বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ও ময়মনসিংহ জেলা শাখার নেতৃবৃন্দের পাশাপাশি বিভিন্ন সাংবাদিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা অংশ নিতে আগ্রহী। ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা, জামালপুর ও গাজীপুর অঞ্চলের বিভিন্ন গণমাধ্যমে কর্মরত সাংবাদিক ও সংগঠনের প্রতিনিধিসহ শতাধিক ব্যক্তির অংশগ্রহণের আগ্রহ রয়েছে বলে আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সংগঠনটির মতে, এ সভা শুধু সাংবাদিক হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবি নয়; বরং সাংবাদিকদের পেশাগত দায়িত্ব পালনে নিরাপত্তা, পুলিশ প্রশাসনের সঙ্গে কার্যকর সমন্বয় এবং ভবিষ্যতে সাংবাদিকদের ওপর হামলা ও নির্যাতন প্রতিরোধের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবহিত করার উদ্যোগ
আবেদনের অনুলিপি সদয় অবগতি ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য বাংলাদেশ পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি), বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিলের চেয়ারম্যান, ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা, জামালপুর ও গাজীপুরের পুলিশ সুপার এবং নেত্রকোনার জেলা প্রশাসকের কাছে পাঠানোর কথা উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি সংগঠনটির কেন্দ্রীয় ইউনিটের চেয়ারম্যান, নেত্রকোনা জেলা প্রেস ক্লাবের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক এবং সংশ্লিষ্ট সাংবাদিক সংগঠনগুলোর নেতৃবৃন্দকেও অনুলিপি দেওয়ার কথা রয়েছে।
আবেদনের শেষাংশে ময়মনসিংহ রেঞ্জ ডিআইজির সুবিধাজনক তারিখ ও সময়ে প্রতিনিধিদলের সঙ্গে মতবিনিময় সভার সুযোগ দেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়েছে।
সাংবাদিক নির্যাতন প্রতিরোধ সেল বাংলাদেশের নেতৃবৃন্দ আশা প্রকাশ করেছেন, পুলিশ প্রশাসনের সহযোগিতায় সাংবাদিক হত্যাকাণ্ডের তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়ায় অগ্রগতি, নিহতদের পরিবারের নিরাপত্তা এবং গণমাধ্যমকর্মীদের জন্য নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার পথ আরও সুগম হবে। তাঁদের মতে, সাংবাদিকদের নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং সাংবাদিক সংগঠনগুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয় গড়ে তোলা সময়ের দাবি।