ঢাকা | বঙ্গাব্দ

বাংলাদেশের দুর্গাপূজা নিয়ে ভারতীয় গণমাধ্যমে আলোচনা, উঠে এলো ঐতিহ্য-সম্প্রীতি ও নিরাপত্তার চিত্র

বাংলাদেশের দুর্গাপূজা মানেই শুধু ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য, শিল্প-সংস্কৃতি, পারিবারিক বন্ধন ও সামাজিক সম্প্রীতি। ঢাকার বনানী, রামকৃষ্ণ মিশন, জগন্নাথ হল ও ঐতিহাসিক ঢাকেশ্বরী মন্দির থেকে শুরু করে নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন পূজামণ্ডপ—এবারের দুর্গোৎসবের এমন বৈচিত্র্যময় চিত্র তুলে ধরেছে ভারতের সংবাদমাধ্যম ‘প্রথম কলকাতা’। ২০২৬ সালের দুর্গাপূজায় বাংলাদেশের মণ্ডপসজ্জা, প্রতিমার নান্দনিকতা, দর্শনার্থীদের উপস্থিতি এবং স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণ বিশেষভাবে উঠে এসেছে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমটির প্রতিবেদনে। পাশাপাশি নতুন সরকারের আমলে সরকারি ছুটি বৃদ্ধি, আর্থিক অনুদান এবং নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়েও তৈরি হয়েছে আলোচনা।
  • আপলোড তারিখঃ 22-10-2026 ইং |
  • নিউজটি দেখেছেনঃ 1683 জন
বাংলাদেশের দুর্গাপূজা নিয়ে ভারতীয় গণমাধ্যমে আলোচনা, উঠে এলো ঐতিহ্য-সম্প্রীতি ও নিরাপত্তার চিত্র ছবির ক্যাপশন: বনানীর শিল্পসমৃদ্ধ মণ্ডপ থেকে নারায়ণগঞ্জের শতবর্ষী আয়োজন, আলোচনায় নিরাপত্তা ও নতুন সরকারের উদ্যোগ

নিজস্ব প্রতিবেদক:

বাংলাদেশের দুর্গাপূজা মানেই শুধু ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য, শিল্প-সংস্কৃতি, পারিবারিক বন্ধন ও সামাজিক সম্প্রীতি। ঢাকার বনানী, রামকৃষ্ণ মিশন, জগন্নাথ হল ও ঐতিহাসিক ঢাকেশ্বরী মন্দির থেকে শুরু করে নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন পূজামণ্ডপ—এবারের দুর্গোৎসবের এমন বৈচিত্র্যময় চিত্র তুলে ধরেছে ভারতের সংবাদমাধ্যম ‘প্রথম কলকাতা’।

২০২৬ সালের দুর্গাপূজায় বাংলাদেশের মণ্ডপসজ্জা, প্রতিমার নান্দনিকতা, দর্শনার্থীদের উপস্থিতি এবং স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণ বিশেষভাবে উঠে এসেছে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমটির প্রতিবেদনে। পাশাপাশি নতুন সরকারের আমলে সরকারি ছুটি বৃদ্ধি, আর্থিক অনুদান এবং নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়েও তৈরি হয়েছে আলোচনা।

শিল্প-ঐতিহ্যে আলাদা আকর্ষণ ঢাকার পূজামণ্ডপ

ঢাকার বনানীর দুর্গাপূজা এবারের উৎসবের অন্যতম আকর্ষণ হিসেবে উঠে এসেছে। বাঁশ, বেত ও মাটির কারুকাজে সাজানো মণ্ডপে ঐতিহ্যবাহী শিল্পের সঙ্গে আধুনিক সৃজনশীলতার সমন্বয় ঘটেছে। সপ্তমীর সন্ধ্যায় দর্শনার্থীদের দীর্ঘ সারি এবং প্রতিমার নান্দনিক অলংকরণ উৎসবের আকর্ষণ আরও বাড়িয়ে তোলে।

ঝিনুক ও মুক্তার মতো উপকরণে সাজসজ্জার পাশাপাশি প্রতিমার ঐতিহ্যবাহী রূপ মণ্ডপটিকে দিয়েছে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য। শিল্পনির্ভর এই আয়োজন কলকাতার বিষয়ভিত্তিক দুর্গাপূজার কথাও মনে করিয়ে দেয়।

অন্যদিকে ঢাকার রামকৃষ্ণ মিশনের দুর্গাপূজায় প্রাধান্য পেয়েছে শান্ত ও আধ্যাত্মিক পরিবেশ। একচালা প্রতিমা, মঠ-মন্দিরের আবহ এবং ধর্মীয় ঐতিহ্যের সমন্বয়ে এখানকার আয়োজন পেয়েছে আলাদা মাত্রা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলের পূজায় ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার পাশাপাশি শিক্ষার্থী ও তরুণদের অংশগ্রহণ, আলোকসজ্জা এবং সামাজিক মিলন উৎসবকে প্রাণবন্ত করে তুলেছে। তবে হলটির সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে ১৯৮৫ সালের ১৫ অক্টোবরের মর্মান্তিক দুর্ঘটনার স্মৃতিও। ফলে উৎসবের আনন্দের পাশাপাশি অতীতের বেদনাবিধুর ঘটনাও স্মরণ করিয়ে দেয় এই প্রাঙ্গণ।

বাংলাদেশের হিন্দু সম্প্রদায়ের কাছে বিশেষ ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় গুরুত্ব বহন করে ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরের দুর্গাপূজা। মন্দির চত্বরের পূজামণ্ডপ, দর্শনার্থীদের উপস্থিতি এবং রাতের উৎসবমুখর পরিবেশ বাংলাদেশের দুর্গোৎসবের ঐতিহ্যকে তুলে ধরেছে।

নারায়ণগঞ্জের পূজায় বাবা-মা-কন্যার সম্পর্কের গল্প

ঢাকার বাইরে নারায়ণগঞ্জের দুর্গাপূজায়ও রয়েছে বৈচিত্র্য। এখানে কোথাও শতবর্ষের ঐতিহ্য, কোথাও আবার মণ্ডপসজ্জায় উঠে এসেছে পারিবারিক সম্পর্ক ও মানবিক অনুভূতির গল্প।

‘প্রথম কলকাতা’র ভিডিও-বিবরণ অনুযায়ী, নারায়ণগঞ্জের আমলাপাড়া সর্বজনীন দুর্গাপূজা ১৪৪ বছরের পুরোনো। দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য ধরে রাখা এই আয়োজনে প্রতিমা, মঞ্চ ও আলোকসজ্জা দর্শনার্থীদের আকর্ষণ করে।

রামকানাইয়ের আখড়ার পূজায় বাবার সঙ্গে সন্তানের সম্পর্ককে কেন্দ্র করে মণ্ডপসজ্জা করা হয়েছে। বাবার হাত ধরে বেড়ে ওঠা, তাঁর আশ্রয়ে নিরাপত্তা খুঁজে পাওয়া এবং জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে পিতৃস্নেহের গুরুত্ব—এসব অনুভূতি শিল্পের মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।

অন্য একটি মণ্ডপে গুরুত্ব পেয়েছে মা ও সন্তানের সম্পর্ক। মাতৃত্বের মমতা এবং সন্তানের প্রতি মায়ের ভালোবাসাকে কেন্দ্র করে সাজানো হয়েছে আয়োজন। আর নিতাইগঞ্জের পূজায় কন্যাসন্তানের বেড়ে ওঠা, বাবার হাত ধরে পথচলা এবং জীবনের নতুন অধ্যায়ে প্রবেশের গল্প তুলে ধরা হয়েছে।

বাবা, মা ও কন্যাকে ঘিরে এসব শিল্পভাবনা দুর্গোৎসবকে কেবল ধর্মীয় আয়োজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেনি; বরং মানুষের সম্পর্ক, ভালোবাসা ও পারিবারিক মূল্যবোধ প্রকাশের একটি সাংস্কৃতিক পরিসর তৈরি করেছে।

নারায়ণগঞ্জের নতুন পালপাড়া, শ্রীশ্রী শিব-শীতলা-তারা মায়ের মন্দির, ঠাকুর অনুকূলচন্দ্রের আশ্রমসংলগ্ন পূজামণ্ডপ এবং বলদেবজিউর মন্দিরের আয়োজনেও রয়েছে ঐতিহ্যের ছাপ।

এ ছাড়া ডালপট্টি, তানবাজার, শাহাপাড়া ও নয়ামাটির মতো এলাকায় স্থানীয় পাড়া ও ব্যবসাকেন্দ্রকে ঘিরে পূজার আয়োজন করা হয়েছে। ভিডিও-বিবরণে তানবাজারের সর্বজনীন দুর্গাপূজাকে ৮৫ বছরের পুরোনো বলে উল্লেখ করা হয়েছে। কোথাও বিস্তৃত আলোকসজ্জা, কোথাও ছোট মন্দিরের প্রতিমাকে কেন্দ্র করে স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণ—সব মিলিয়ে নারায়ণগঞ্জের পূজায় ফুটে উঠেছে বাংলাদেশের সর্বজনীন উৎসবের বহুমাত্রিক চিত্র।

নতুন সরকারের আমলে ছুটি ও অনুদান বৃদ্ধি

এবারের দুর্গাপূজাকে ঘিরে বাংলাদেশের প্রশাসনিক উদ্যোগও ভারতীয় গণমাধ্যমের আলোচনায় এসেছে। সরকারি সংবাদ সংস্থা বাসসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালে দুর্গাপূজা উপলক্ষে ২০, ২১ ও ২২ অক্টোবর সরকারি ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। এর সঙ্গে ২৩ ও ২৪ অক্টোবরের সাপ্তাহিক ছুটি যুক্ত হওয়ায় সরকারি কর্মীদের জন্য টানা পাঁচ দিনের অবকাশ তৈরি হয়েছে।

দুর্গাপূজার সরকারি অনুদানও চার কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে পাঁচ কোটি টাকা করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। পূজা আয়োজকদের আর্থিক সহায়তা এবং উৎসবের আয়োজন নির্বিঘ্ন করতে এ উদ্যোগকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

৩৩ হাজারের বেশি মণ্ডপ ঘিরে নিরাপত্তার প্রস্তুতি

উৎসবের আনন্দের পাশাপাশি নিরাপত্তার বিষয়টিও এবারের দুর্গাপূজায় বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। বাসসের ১২ অক্টোবরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সারা দেশে ৩৩ হাজার ৮৫১টি পূজামণ্ডপকে কেন্দ্র করে নিরাপত্তা পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। নজরদারি ক্যামেরা, নিয়মিত টহল, বিশেষ নিরাপত্তাব্যবস্থা এবং প্রয়োজনে আকাশপথে নজরদারির প্রস্তুতির কথাও জানানো হয়েছে।

‘দ্য ডেইলি স্টার’-এর ১৬ অক্টোবরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সীমান্তরক্ষী বাহিনীকে ২ হাজার ৭৮৭টি পূজামণ্ডপের নিরাপত্তায় দায়িত্ব দেওয়ার পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করা হয়েছিল। বিশেষ করে সীমান্তবর্তী ও দুর্গম এলাকার মণ্ডপগুলোতে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ওপর জোর দেওয়া হয়।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও দুর্গাপূজা উপলক্ষে বিভিন্ন পূজামণ্ডপ পরিদর্শন করেছেন। ‘দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-এর ২১ অক্টোবরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, রংপুর, রাজশাহী ও চট্টগ্রামে পূজামণ্ডপ পরিদর্শনের সময় তিনি সব ধর্মের মানুষের সমান অধিকার নিশ্চিত করার কথা বলেছেন।

তবে নিরাপত্তার প্রস্তুতি ও প্রশাসনিক ঘোষণা বাস্তবে কতটা কার্যকর হয়েছে, তা মূল্যায়নের জন্য উৎসব চলাকালীন পরিস্থিতির পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে ধর্মীয় স্বাধীনতা, সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা এবং নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ।

দুই বাংলার সাংস্কৃতিক বন্ধনে দুর্গোৎসব

বাংলাদেশের দুর্গাপূজার চিত্রে দুই বাংলার সাংস্কৃতিক বন্ধনের বিষয়টিও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। কলকাতা ও বাংলাদেশের পূজামণ্ডপে শিল্পভাবনা, প্রতিমার ঐতিহ্যবাহী রূপ, আলোকসজ্জা এবং মানুষের অংশগ্রহণে যেমন মিল রয়েছে, তেমনি রয়েছে নিজস্ব স্থানীয় বৈশিষ্ট্য।

বনানীর শিল্পসমৃদ্ধ মণ্ডপ, ঢাকেশ্বরী মন্দিরের ঐতিহাসিক গুরুত্ব, জগন্নাথ হলের শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ এবং নারায়ণগঞ্জের পুরোনো পূজাগুলোর ধারাবাহিকতা—সব মিলিয়ে বাংলাদেশের দুর্গোৎসবের একটি বহুমাত্রিক ছবি উঠে এসেছে।

বনানীর পূজামণ্ডপ পরিদর্শন করে ভারতীয় হাইকমিশনারও বাংলাদেশের দুর্গাপূজার বর্ণময় ও সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশের প্রশংসা করেছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। দুই দেশের সাংস্কৃতিক সাদৃশ্যও এ আয়োজনের মধ্য দিয়ে সামনে এসেছে।

দুই বাংলার মানুষের কাছে দুর্গাপূজা শুধু ধর্মীয় উৎসব নয়, এটি পারিবারিক স্মৃতি, সামাজিক যোগাযোগ ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যেরও অংশ। ঢাকের শব্দ, প্রতিমার সামনে প্রার্থনা, মণ্ডপে আড্ডা কিংবা আলোকসজ্জায় সাজানো রাতের শহর—এসব অভিজ্ঞতা সীমান্তের দুই পাশের মানুষকে আবেগের বন্ধনে যুক্ত করে।

সম্প্রীতির বার্তা, সঙ্গে অধিকার ও নিরাপত্তার প্রশ্ন

বাংলাদেশের দুর্গাপূজার এবারের চিত্রে একদিকে রয়েছে শিল্পীদের সৃজনশীলতা, ঐতিহ্যবাহী আয়োজন এবং মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ; অন্যদিকে রয়েছে নিরাপত্তা, ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সমান অধিকারের প্রশ্ন।

সরকারি ছুটি বৃদ্ধি, অনুদান এবং নিরাপত্তার পরিকল্পনা উৎসব আয়োজনের ক্ষেত্রে সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে। তবে এসব উদ্যোগের সাফল্য নির্ভর করবে বাস্তবায়ন এবং সব সম্প্রদায়ের মানুষের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপনের নিশ্চয়তার ওপর।

ঢাকার বনানী থেকে নারায়ণগঞ্জের নয়ামাটি—বিভিন্ন পূজামণ্ডপের আয়োজন দেখায়, বাংলাদেশের দুর্গোৎসবের শক্তি শুধু প্রতিমা বা মণ্ডপের জাঁকজমকে সীমাবদ্ধ নয়। এর কেন্দ্রে রয়েছে মানুষের অংশগ্রহণ, দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য এবং পারস্পরিক সম্পর্কের বন্ধন।

দেবী দুর্গার আরাধনা তাই অশুভ শক্তির বিনাশের প্রার্থনার পাশাপাশি সহমর্মিতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সম্প্রীতির বার্তাও বহন করে। ভারতীয় গণমাধ্যমে বাংলাদেশের দুর্গাপূজার এই বহুমাত্রিক চিত্র দুই বাংলার সাংস্কৃতিক সম্পর্কের পাশাপাশি দেশের ধর্মীয় সহাবস্থান ও নাগরিক অধিকারের প্রশ্নকেও নতুন করে সামনে এনেছে।



নিউজটি পোস্ট করেছেনঃ my24news

কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ
notebook

সাংবাদিক এইচ টি তোফাজ্জালের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার ও নিঃশর্ত মুক্তির দাবিতে ময়মনসিংহে মানববন্ধন